রংপুর রাইডার্সকে হারিয়ে এলিমিনেটর ম্যাচে বাজিমাত করেছে খুলনা টাইগার্স। এই দাপুটে জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদ বলেছিলেন, “যে দলই আসুক, টি-টোয়েন্টিতে সবাই সমান।” তবে শেষ পর্যন্ত খুলনার সামনে এখন প্রতিপক্ষ চিটাগং কিংস।
আজ (বুধবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে মুখোমুখি হবে খুলনা ও চিটাগং। ফাইনালে ফরচুন বরিশালের সঙ্গী হওয়ার টিকিট পেতে দুই দলই সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে।
লিগ পর্বে শেষ দুটি ম্যাচ থেকেই ছন্দে ফেরা খুলনা টাইগার্স এলিমিনেটর ম্যাচে ফেভারিট রংপুর রাইডার্সকে উড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে কোয়ালিফায়ার ম্যাচে ফরচুন বরিশালের কাছে পরাজিত হয়ে ফাইনালের প্রথম সুযোগ হাতছাড়া করেছে চিটাগং কিংস।
দুই দলের সামনেই দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠার হাতছানি। ২০১৯-২০ মৌসুমে প্রথম বিপিএলে অংশ নিয়ে ফাইনালে রাজশাহী রয়্যালসের কাছে ২১ রানে হেরে ট্রফি হাতছাড়া করেছিল খুলনা টাইগার্স।
অন্যদিকে দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর চলতি আসরে বিপিএলে ফিরেছে চিটাগং কিংস। ২০১৩ সালে মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্বে ফাইনালে উঠলেও ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের কাছে ৪৩ রানে হার মানতে হয়েছিল তাদের।
আজকের লড়াইয়ের পরই নির্ধারণ হবে কে পাচ্ছে ফাইনালে ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে চূড়ান্ত লড়াইয়ের সুযোগ।
দীর্ঘ বিরতি শেষে চিটাগংয়ের ফেরাটা এখনও পর্যন্ত সফলই বলতে হবে। খুলনার বিপক্ষে হার দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে টানা চার জয়ে প্লে-অফের পথে এগিয়ে যায় দলটি। লিগ পর্বের শেষ তিন ম্যাচে রংপুর, সিলেট ও বরিশালকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুইয়ে থেকে প্রথম কোয়ালিফায়ারে জায়গা করে নেয় তারা।
সব মিলিয়ে প্রথম পর্বের ১২ ম্যাচে চিটাগংয়ের জয় ৮টি। রংপুরেরও ছিল সমান ৮ জয়। তবে শ্রেয়তর নেট রান রেটে প্রথম কোয়ালিফায়ার খেলার সুযোগ পায় চিটাগং। সোমবার ওই ম্যাচে বরিশালের কাছে ৯ উইকেটে হেরেছে মোহাম্মদ মিঠুনের দল।
শুরুর ম্যাচগুলিতে চিটাগংয়ের ব্যাটিংকে টেনে নেন উসমান খান ও গ্রাহাম ক্লার্ক। শতরানের স্বাদ পান দুজনই। পরের দিকে অবশ্য সেই ধারাবাহিকতা তারা ধরে রাখতে পারেননি। জাতীয় দলের ডাকে ফিরে যাওয়ার আগে একটি শতরানের সঙ্গে দুটি ফিফটিতে ৮ ইনিংসে ২৮৫ রান করেন উসমান। এখন পর্যন্ত ১২ ইনিংসে দলের সর্বোচ্চ ৩৮৩ রান করেছেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান ক্লার্ক।
ছয় ব্যাটসম্যান নিয়ে সাজানো ব্যাটিং বিভাগে শেষের দিকে দ্রুত রান করার দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করছেন শামীম হোসেন। এখন পর্যন্ত ১৩ ইনিংসে দুই ফিফটিতে ১৬২.৭৩ স্ট্রাইক রেটে তার সংগ্রহ ৩৪৫ রান। উইকেটের চার দিকে অভিনব সব শটে তিনি টি-টোয়েন্টির প্রকৃত স্বাদ উপহার দিচ্ছেন দর্শকদের।
শুরুর দিকে তেমন ভালো করতে না পারা পারভেজ হোসেন শেষ দিকে ফিরেছেন রানে। লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে বরিশালের বিপক্ষে তিনি খেলেছেন ৭৫ রানের ইনিংস। এর আগে রংপুরের বিপক্ষে করেছিলেন ৪১ রান। এর বাইরে মিঠুন, হায়দার আলিরাও কার্যকর অবদান রাখায় এখনও বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে তারা।
বোলিংয়ে এখন পর্যন্ত চিটাগংয়ের সেরা সৈয়দ খালেদ আহমেদ। ১২ ম্যাচে অভিজ্ঞ পেসারের শিকার ১৯ উইকেট। রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম ১২ ম্যাচের ওভারপ্রতি গড়ে মাত্র ৬.৫৬ রান খরচ করে নিয়েছেন ১৪ উইকেট। এছাড়া শরিফুল ইসলাম, আরাফাত সানিরাও রেখেছেন কার্যকর ভূমিকা।
খুলনার ক্ষেত্রে একদমই সহজ ছিল না দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার পর্যন্ত যাত্রা। পরপর দুই জয়ে আসর শুরু করলেও এরপর টানা চার ম্যাচ হেরে যায় মেহেদী হাসান মিরাজের দল। পরের চার ম্যাচের দুটিতে সিলেট ও রাজশাহীকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে কোনোমতে টিকে থাকে তারা।
প্লে-অফের টিকেট পেতে শেষ দুই ম্যাচে রংপুর ও ঢাকার বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না তাদের সামনে। সেরা চারের লড়াই শুরুর আগেই তাই ‘নকআউট’ শুরুর ঘোষণা দিয়ে দেন অধিনায়ক মিরাজ। দুই ম্যাচেই দাপুটে জয়ে রাজশাহীকে পেছনে ফেলে এলিমিনেটরের টিকেট পায় তারা।
পরে সোমবারের ম্যাচে আন্দ্রে রাসেল, টিম ডেভিড ও জেমস ভিন্সকে দলে যোগ করে শক্তি বাড়ানো রংপুরকে মাত্র ৮৫ রানে গুঁড়িয়ে দেয় খুলনা। রান তাড়ায় শুধু মিরাজের উইকেট হারিয়ে সহজ জয় পায় তারা।
টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত যাত্রায় দেশি ক্রিকেটাররাই এগিয়ে রেখেছে খুলনাকে। ব্যাট হাতে এক সেঞ্চুরির সঙ্গে তিন ফিফটিতে ৪৯২ রান নিয়ে এখন পর্যন্ত আসরের সবচেয়ে সফল খুলনার বাঁহাতি ওপেনার মোহাম্মদ নাঈম শেখ। রান তোলার গতি নিয়ে সবসময় প্রশ্নের মুখে পড়া নাঈম এবার রান করেছেন প্রায় ১৪৮ স্ট্রাইক রেটে। এছাড়া প্রয়োজনের সময় মাহিদুল ইসলাম, উইলিয়াম বসিস্টোরা গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসে এগিয়ে দিয়েছেন দলকে।
বোলিংয়ে ১০ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে দলের সেরা বাঁহাতি পেসার আবু হায়দার। নাসুম, হাসান মাহমুদরাও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে দলের জয়ে রাখছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। রংপুরের বিপক্ষে এলিমিনেটর ম্যাচেই যেমন ১৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন নাসুম। এর আগের ম্যাচে ৪ ওভারে মাত্র ৫ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন হাসান।
আর ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিরাজ। এখন পর্যন্ত ১৩ ইনিংসে দুই ফিফটিতে তার সংগ্রহ ৩৫৩ রান। টুর্নামেন্টের মাঝামাঝি সময় থেকে ওপেনিংয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ব্যাটিংয়ের চিত্রই বদলে দিয়েছেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার। ওপেনার হিসেবে ৬ ইনিংসে তিনি করেছেন ২২০ রান।
অফ স্পিনে ১৩ ম্যাচে তার শিকার ১৩ উইকেট। এলিমিনেটর ম্যাচে মাত্র ১০ রানে তিনি নেন ৩ উইকেট। এর আগে ঢাকার বিপক্ষে ৪ ওভারে মাত্র ৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে জেতেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। সব মিলিয়ে খুলনার সাত জয়ের তিনটিতে ম্যাচ সেরা মিরাজ। এর সঙ্গে ফিল্ডিংয়ে ৭টি ক্যাচ নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে খুলনা অধিনায়ক।
মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের আসরে খুলনার সামনে এবার চিটাগং-বাধা। লিগ পর্বের দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে একটি করে জয় পেয়েছে দুই দলই। এবার লড়াইটা শুধু আরেকটি জয়ের নয়, ট্রফি জয়ের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ারও।